চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে বারবার মৃত্যু কেন কোথায় ব্যর্থতা
- আপডেট সময় : ০২:৫০:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
আগাম সতর্কতা ছিল, তবু ঠেকানো গেল না পাহাড়ধস: প্রস্তুতির ঘাটতিতে প্রাণ গেল ২৯ জনের
পাহাড়ধসের আশঙ্কা ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগেই ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা দিয়েছিল। প্রশাসনও জানত, টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবু সময়মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে চার জেলায় পাহাড়ধসে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৪ জনই শিশু। তাঁদের প্রায় সবাই পাহাড়ের ঢাল বা পাদদেশে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বসবাস করতেন।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। সেখানে ১৯ জন মারা গেছেন, যাঁদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। এছাড়া বান্দরবানে পাঁচজন, চট্টগ্রামে চারজন এবং রাঙামাটিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলা কেবল বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আগেভাগে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, পাহাড় সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই প্রাণহানি কমানোর কার্যকর উপায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, প্রশাসন সাধারণত দুর্ঘটনা ঘটার সময়ই সক্রিয় হয়। বৃষ্টি শুরু হলে মাইকিং করে মানুষকে সরে যেতে বলা হয়। কিন্তু শুধু মাইকিং করে মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণ, পুনর্বাসন এবং পাহাড়কে নিরাপদ করার কাজ শেষ করতে হবে।
সবচেয়ে বেশি মৃত্যু কক্সবাজারে
এবারের পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। নিহত ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জনই রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। গত ছয় বছরে শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই পাহাড়ধসে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯ জনে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ১৪ লাখের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। গত দেড় বছরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে আরও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই পাহাড় কেটে বা ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে ঘর নির্মাণ করেছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের টানা বৃষ্টিতে রোহিঙ্গা শিবিরে ৯৫টি ভূমিধস হয়েছে। এতে ৪ হাজার ৩০৭ জন গৃহহীন হয়েছেন এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আরও ২৬ হাজার ১১৯ জন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের প্রায় ৮০ শতাংশ ঘরই পাহাড়ের ওপর, ঢালে কিংবা পাদদেশে নির্মিত। এখনো এক থেকে দেড় লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এবারের নিহতদের অধিকাংশই নতুন করে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা।
প্রস্তুতির ঘাটতিতে বাড়ছে প্রাণহানি
আবহাওয়া অধিদপ্তর গত শনিবার থেকেই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। এরপর টানা বৃষ্টিতে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এত স্বল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টিপাত বিরল ঘটনা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টি শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের চিহ্নিত করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছেও বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ঠিক কত মানুষ বসবাস করছেন, তার হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই।
চট্টগ্রামের অবস্থাও একই রকম। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নগরের ২৬টি পাহাড়ে বর্তমানে ৬ হাজার ৫৫৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বা অবৈধ বসতি রয়েছে। তবে এই তথ্য তিন বছর আগের। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর ধারণা, এরপর আরও নতুন বসতি গড়ে উঠেছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসনের হিসাবে, জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে ১ হাজার ৪৬৮টি পরিবার। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম হাসান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিয়মিত নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হচ্ছে। এরপরও কেউ না সরলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধান হিসেবে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেন।
সুপারিশ আছে, বাস্তবায়ন নেই
চট্টগ্রামে পাহাড়ধস নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হওয়ার পর গঠিত তদন্ত কমিটি ৩৬ দফা সুপারিশ করেছিল। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা বন্ধ, পাহাড়ের ঢালে নতুন বসতি নির্মাণ রোধ, ন্যাড়া পাহাড়ে বনায়ন এবং সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ ছিল।
এর এক দশক পর ২০১৭ সালের জুনে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে আরও ১৬৮ জন প্রাণ হারান। দ্বিতীয় তদন্ত কমিটিও প্রায় একই ধরনের ৩৫ দফা সুপারিশ দেয়। অর্থাৎ দুই দফা বড় বিপর্যয়ের পরও সমস্যার ধরন যেমন বদলায়নি, সমাধানের পথও একই রয়ে গেছে।
বাস্তবতা হলো, ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম নগরের ১১টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করত ৬৬৬টি পরিবার। বর্তমানে ২৬টি পাহাড়ে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৫টি পরিবার। বিভিন্ন সংগঠনের ধারণা, ২০২৩ সালের জরিপের পরও নতুন করে আরও অনেক বসতি গড়ে উঠেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, প্রয়োজন হলে মানুষকে জোর করেও নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। কিন্তু অনেকেই পরে আবার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ফিরে যান। তাঁর মতে, পাহাড়ের অবৈধ বসতির পেছনে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে উচ্ছেদ অভিযানও বাধাগ্রস্ত হয়।
বৃষ্টি নয়, ঝুঁকি তৈরি হয় সারা বছর
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়ধসের জন্য শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়। বৃষ্টি কেবল শেষ ধাক্কাটি দেয়। প্রকৃত ঝুঁকি তৈরি হয় বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে বসতি নির্মাণ এবং পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে।
টানা বৃষ্টিতে মাটির ভেতরে পানি প্রবেশ করলে মাটির কণাগুলোর বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন ঢালের মাটি নিজের ওজন ধরে রাখতে পারে না এবং একসময় পুরো স্তর নিচে ধসে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলা কেবল আশ্রয়কেন্দ্র খোলা বা সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের হালনাগাদ তালিকা তৈরি, আগাম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, নিরাপদ পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং নতুন অবৈধ বসতি নির্মাণ ঠেকাতে সারা বছর সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর একই ধরনের প্রাণহানির অন্যতম কারণ হলো পাহাড়ধসকে এখনো মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখা হয়। বর্ষা এলেই প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ে, কিন্তু বছরের বাকি সময় ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং নতুন বসতি নির্মাণ রোধে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, সরকারের হাতে আইন, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি)—সবই রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তাও ছিল। তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আগে থেকেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া গেল না কেন?
তিনি আরও বলেন, অতীতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রশাসন চাইলে এমন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তাঁর মতে, এবার মাঠ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একধরনের অনিশ্চয়তা ও ভীতি কাজ করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিত করা, আগেভাগে সরিয়ে নেওয়া এবং পরে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালনে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন তিনি।


















