ঢাকা ০২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ এসআই বিরুলিয়ার ইউনিয়ন ফাঁড়ি ইনচার্জ আল আমীন উলিপুরে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত নিজেকে আধুনিক ও আপডেটেড রেখে জনগণের সেবা করতে হবে: আইজিপি উৎসবের আমেজে বাঘায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ব্যাপক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত আদালতে ২০ মিনিট অবস্থান শেষে সিঁড়ি থেকে পড়ে যান শিরীন শারমিন রাজশাহীতে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় মিথ্যা অপবাদের অভিযোগ উলিপুর হাসপাতালে ছাদের পলেস্তারা খসে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেন বাবা-মেয়ে বাঘায় মাদকসহ একজন আটক, ৪০ পিস ইয়াবা উদ্ধার মনিগ্রামে পুকুরে চা বিক্রেতার লাশ উদ্ধার, রহস্য ঘিরে চাঞ্চল্য ২০ বছর পলাতক থাকার পর রাজশাহীতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার

আদালতে ২০ মিনিট অবস্থান শেষে সিঁড়ি থেকে পড়ে যান শিরীন শারমিন

আনোয়ার হোসেন আন্নু বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৫:৪০:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
54

জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরুদ্দেশ থাকা শিরীন শারমিন চৌধুরী দেড় বছরের বেশি সময় পর গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন কারাগারে।

সাবেক এই স্পিকারকে অভ্যুত্থানের সময়কার একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন ছিল পুলিশের। তবে তাতে সায় দেননি আদালত। আবার জামিনের আবেদনও নাকচ করে দেন বিচারক।

ঢাকার মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০ মিনিটের শুনানি শেষে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। এ আদেশের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান তুললে তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়।

৬০ বছর বয়সী শিরীন শারমিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সংসদে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন। এরপর ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত টানা এ পদে ছিলেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শিরীন শারমিন সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন ঢাকা সেনানিবাসে। তারপর দলটির অনেক নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার হলেও শিরীন শারমিনের কোনো খোঁজ আর পাওয়া যাচ্ছিল না।

সরকার পতন ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার ২৭ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর স্পিকারের পদ থেকে তাঁর পদত্যাগের খবর আসে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরোটা সময়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কিছু আর জানা যায়নি।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আজ মঙ্গলবার ভোরে আকস্মিকভাবে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়ি থেকে শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তারের খবর দেয়। তাঁকে প্রথমে নেওয়া হয় রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবির কার্যালয়ে।

এরপর জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুপুরে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে করে নেওয়া হয় পুরান ঢাকার আদালতে। নীল রঙের শাড়ি পরা শিরীন শারমিনকে ঘিরে ছিলেন বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্য।

বেলা ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে শিরীন শারমিনকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। রিমান্ড শুনানির জন্য তাঁকে আদালতে তোলা হয় বেলা ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে। আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ভিড়ে এ সময় আদালতকক্ষ ছিল পরিপূর্ণ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের করা দুই দিন রিমান্ডের আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী।

ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এই আসামি ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ ছিলেন। তিনি বিনা ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি ‘ফ্যাসিস্ট সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে আন্দোলনে গুলি চালানোরও নির্দেশ’ দেন। এ মামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে রিমান্ড আবেদন বাতিল করে শিরীন শারমিনকে জামিন দিতে আবেদন করেন ব্যারিস্টার মামুন, শামীম আল সাইফুল সোহাগসহ কয়েকজন আইনজীবী।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ‘এ মামলায় ১৩০ জনের নামসহ অজ্ঞানতানামা অনেকে আসামি আছেন। এজাহারে শিরীন শারমিনের নাম ছাড়া আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এজাহারে ৩ নম্বরে তাঁর নাম থাকা ছাড়া আর একটা শব্দও যদি কিছু থাকে, তবে জামিন চাইব না।

ওই আইনজীবীরা বলেন, মামলায় ঘটনার তারিখ ১৮ জুলাই, ২০২৪। কিন্তু মামলাটি করা হয় ২০২৫ সালের ২৫ মে, অর্থাৎ ১০ মাস ৭ দিন পর মামলাটি করা হয়েছে।

যিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তাঁর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, শিরীন শারমিন গুলি করেননি।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আরও বলেন, ঘটনার সময় শিরীন শারমিন জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। তিনি সাংবিধানিকভাবে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় করার অভিযোগ নেই। পরে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেছেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সরাসরি পদত্যাগপত্র দিয়েছেন।

পেশায় আইনজীবী শিরীন শারমিনের ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে সদস্যপদ থাকার কথা তুলে ধরে এবং নারী হিসেবেও তাঁকে জামিন দেওয়ার আবেদন করেন আসামিপক্ষের কৌঁসুলিরা।

শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত রিমান্ড ও জামিন আবেদন—দুটোই নামঞ্জুর করে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এরপর ৩টা ২০ মিনিটে শিরীন শারমিনকে পুলিশ আদালতের হাজতখানায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

সিঁড়িতে পড়ে গেলেন শিরীন শারমিন

শিরীন শারমিনকে হাজতখানায় যখন নেওয়া হচ্ছিল, তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল আইনজীবী স্লোগান তুললে উত্তেজনা দেখা দেয়। তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়।

এ সময় আদালত থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় ভিড়ের মধ্যে নিচতলার সিঁড়িতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান শিরীন শারমিন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে টেনে তোলেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।

তবে ঢাকা সিএমএম আদালতের হাজতখানায় দায়িত্বরত উপপরিদর্শক মো. মোরশেদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনি পড়েননি। শেষ সিঁড়িতে এসে তাঁর পা একটু বেঁকে যায়। আমাদের নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁকে চারদিক থেকে ধরে রাখেন।

রিমান্ডের আবেদনে যা ছিল

আরো কয়েকটি মামলা থাকলেও শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় জুলাই আন্দোলনে থাকা মো. আশরাফুল ফাহিমকে হত্যাচেষ্টার মামলায়।

এই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলনে ঢাকার লালবাগের আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। তখন আশরাফুল ফাহিমের বাঁ চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলি লাগে।

এরপর ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই লালবাগ থানায় মামলা করেন আশরাফুল ফাহিম। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিপ্লব বড়ুয়া, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পরিকল্পনা ও নির্দেশে পুলিশ সদস্য এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ করেন।

মামলায় আসামির তালিকায় শিরীন শারমীন চৌধুরীকে ৩ নম্বরে রাখা হয়। এজাহারে আরও বলা হয়, ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলাকালে প্রায় ৩১ জন আন্দোলনকারী নিহত হন। মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনা এবং তৃতীয় আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ অন্য আসামিরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জড়িত ছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নির্দেশে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়।

হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আজ মঙ্গলবার ঢাকার আদালতে নেওয়া হয় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন
হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আজ মঙ্গলবার ঢাকার আদালতে নেওয়া হয় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেনছবি: দীপু মালাকার

রিমান্ড আবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন বলে, পলাতক আসামিদের অবস্থান জানা, গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য আসামিকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া দরকার।

গ্রেপ্তারের পর শিরীন শারমিনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যও আদালতকে জানায় ডিবি। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি তাঁর নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে এই মামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে পলাতক আসামিসহ মামলার ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে যান তিনি।

আসামিকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড় ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে পলাতক আসামিদের অবস্থান নির্ণয় করাসহ গ্রেপ্তার এবং মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় ডিবি। আসামি জামিনে মুক্তি পেলে চিরতরে পলাতক হওয়াসহ মামলা তদন্তে বিঘ্ন ঘটানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ডিবি কার্যালয় থেকে আদালতে নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে
শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে ৬ মামলা

ভোরে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আটকের খবর দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।

এরপর ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ ৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

আদালতে ২০ মিনিট অবস্থান শেষে সিঁড়ি থেকে পড়ে যান শিরীন শারমিন

আপডেট সময় : ০৫:৪০:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
54

জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে নিরুদ্দেশ থাকা শিরীন শারমিন চৌধুরী দেড় বছরের বেশি সময় পর গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন কারাগারে।

সাবেক এই স্পিকারকে অভ্যুত্থানের সময়কার একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন ছিল পুলিশের। তবে তাতে সায় দেননি আদালত। আবার জামিনের আবেদনও নাকচ করে দেন বিচারক।

ঢাকার মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০ মিনিটের শুনানি শেষে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। এ আদেশের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান তুললে তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়।

৬০ বছর বয়সী শিরীন শারমিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সংসদে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন। এরপর ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত টানা এ পদে ছিলেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শিরীন শারমিন সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন ঢাকা সেনানিবাসে। তারপর দলটির অনেক নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য গ্রেপ্তার হলেও শিরীন শারমিনের কোনো খোঁজ আর পাওয়া যাচ্ছিল না।

সরকার পতন ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার ২৭ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর স্পিকারের পদ থেকে তাঁর পদত্যাগের খবর আসে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরোটা সময়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে কিছু আর জানা যায়নি।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আজ মঙ্গলবার ভোরে আকস্মিকভাবে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়ি থেকে শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তারের খবর দেয়। তাঁকে প্রথমে নেওয়া হয় রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবির কার্যালয়ে।

এরপর জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুপুরে তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে করে নেওয়া হয় পুরান ঢাকার আদালতে। নীল রঙের শাড়ি পরা শিরীন শারমিনকে ঘিরে ছিলেন বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্য।

বেলা ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে শিরীন শারমিনকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। রিমান্ড শুনানির জন্য তাঁকে আদালতে তোলা হয় বেলা ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে। আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ভিড়ে এ সময় আদালতকক্ষ ছিল পরিপূর্ণ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের করা দুই দিন রিমান্ডের আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী।

ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এই আসামি ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ ছিলেন। তিনি বিনা ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি ‘ফ্যাসিস্ট সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে আন্দোলনে গুলি চালানোরও নির্দেশ’ দেন। এ মামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে রিমান্ড আবেদন বাতিল করে শিরীন শারমিনকে জামিন দিতে আবেদন করেন ব্যারিস্টার মামুন, শামীম আল সাইফুল সোহাগসহ কয়েকজন আইনজীবী।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ‘এ মামলায় ১৩০ জনের নামসহ অজ্ঞানতানামা অনেকে আসামি আছেন। এজাহারে শিরীন শারমিনের নাম ছাড়া আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এজাহারে ৩ নম্বরে তাঁর নাম থাকা ছাড়া আর একটা শব্দও যদি কিছু থাকে, তবে জামিন চাইব না।

ওই আইনজীবীরা বলেন, মামলায় ঘটনার তারিখ ১৮ জুলাই, ২০২৪। কিন্তু মামলাটি করা হয় ২০২৫ সালের ২৫ মে, অর্থাৎ ১০ মাস ৭ দিন পর মামলাটি করা হয়েছে।

যিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তাঁর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, শিরীন শারমিন গুলি করেননি।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আরও বলেন, ঘটনার সময় শিরীন শারমিন জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। তিনি সাংবিধানিকভাবে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় করার অভিযোগ নেই। পরে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেছেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সরাসরি পদত্যাগপত্র দিয়েছেন।

পেশায় আইনজীবী শিরীন শারমিনের ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে সদস্যপদ থাকার কথা তুলে ধরে এবং নারী হিসেবেও তাঁকে জামিন দেওয়ার আবেদন করেন আসামিপক্ষের কৌঁসুলিরা।

শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত রিমান্ড ও জামিন আবেদন—দুটোই নামঞ্জুর করে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এরপর ৩টা ২০ মিনিটে শিরীন শারমিনকে পুলিশ আদালতের হাজতখানায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

সিঁড়িতে পড়ে গেলেন শিরীন শারমিন

শিরীন শারমিনকে হাজতখানায় যখন নেওয়া হচ্ছিল, তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল আইনজীবী স্লোগান তুললে উত্তেজনা দেখা দেয়। তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়।

এ সময় আদালত থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় ভিড়ের মধ্যে নিচতলার সিঁড়িতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান শিরীন শারমিন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে টেনে তোলেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।

তবে ঢাকা সিএমএম আদালতের হাজতখানায় দায়িত্বরত উপপরিদর্শক মো. মোরশেদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনি পড়েননি। শেষ সিঁড়িতে এসে তাঁর পা একটু বেঁকে যায়। আমাদের নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁকে চারদিক থেকে ধরে রাখেন।

রিমান্ডের আবেদনে যা ছিল

আরো কয়েকটি মামলা থাকলেও শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় জুলাই আন্দোলনে থাকা মো. আশরাফুল ফাহিমকে হত্যাচেষ্টার মামলায়।

এই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলনে ঢাকার লালবাগের আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। তখন আশরাফুল ফাহিমের বাঁ চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলি লাগে।

এরপর ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই লালবাগ থানায় মামলা করেন আশরাফুল ফাহিম। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিপ্লব বড়ুয়া, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পরিকল্পনা ও নির্দেশে পুলিশ সদস্য এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ করেন।

মামলায় আসামির তালিকায় শিরীন শারমীন চৌধুরীকে ৩ নম্বরে রাখা হয়। এজাহারে আরও বলা হয়, ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলাকালে প্রায় ৩১ জন আন্দোলনকারী নিহত হন। মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনা এবং তৃতীয় আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ অন্য আসামিরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জড়িত ছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নির্দেশে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়।

হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আজ মঙ্গলবার ঢাকার আদালতে নেওয়া হয় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন
হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আজ মঙ্গলবার ঢাকার আদালতে নেওয়া হয় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেনছবি: দীপু মালাকার

রিমান্ড আবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন বলে, পলাতক আসামিদের অবস্থান জানা, গ্রেপ্তার ও প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য আসামিকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া দরকার।

গ্রেপ্তারের পর শিরীন শারমিনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যও আদালতকে জানায় ডিবি। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি তাঁর নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে এই মামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে পলাতক আসামিসহ মামলার ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে যান তিনি।

আসামিকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড় ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে পলাতক আসামিদের অবস্থান নির্ণয় করাসহ গ্রেপ্তার এবং মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় ডিবি। আসামি জামিনে মুক্তি পেলে চিরতরে পলাতক হওয়াসহ মামলা তদন্তে বিঘ্ন ঘটানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ডিবি কার্যালয় থেকে আদালতে নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে
শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে ৬ মামলা

ভোরে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আটকের খবর দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।

এরপর ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ ৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।