ঢাকা ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন নিয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত উলিপুরে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে ৪০টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জব্দ, পুড়িয়ে ধ্বংস রাজশাহীতে সাংবাদিকদের জন্য তিন দিনের এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং প্রশিক্ষণ শুরু কিশোরগঞ্জে বিএনপি সভাপতিকে কু/পি/য়ে হ/ত্যা জুলাই শহীদ দিবস ২০২৬ বাঘায় আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত আরএমপি পুলিশ কমিশনার ফয়েজুল কবিরের সাথে সাংবাদিক নেতা মাখনের সৌজন্য সাক্ষাৎ নগর উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে আলোচনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাঘায় বৃক্ষরোপণ সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন নিয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো গাড়ি থেকে ইয়াবাসহ তিনজন গ্রেপ্তার

উলিপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে আনসারী দম্পতির সহায়তায় ফিরল ঈদের আনন্দ

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬ ১১৯ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
140

নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও বন্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা কুড়িগ্রামের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদুল আজহা অনেক সময় কেবল নামাজের দিন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে। কোরবানির আনন্দ সেখানে যেন বিলাসিতা। বছরের পর বছর অনেক পরিবার ঈদের দিনেও গরুর মাংসের স্বাদ পায় না।

তবে এবার সেই নিরানন্দ ঈদে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দম্পতি মো. আসাদুজ্জামান আনসারী ও অ্যাডভোকেট নূর উন নাহার আনসারী। তাঁদের উদ্যোগে দুটি গরু কোরবানি হওয়ায় শতাধিক পরিবারের ঘরে ফিরেছে ঈদের হাসি।

২৮ মে বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতলি, বালাডোবার চর এবং পাশের সাহেবের আলগা ইউনিয়নের সাতাশ দাগের চর ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবার এবার কোরবানি দিতে পারেনি।

কোথাও একটি ছাগল কোরবানি হয়েছে, আবার কোথাও সেটিও হয়নি। অনেকেই ঈদের দিন ব্রয়লার মুরগি রান্না করে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন, কেউ তাও পারেননি। এমন বাস্তবতায় আনসারী দম্পতির দেওয়া কোরবানির মাংস যেন ঈদের প্রকৃত আনন্দ হয়ে পৌঁছায় চরবাসীর ঘরে ঘরে। কোরবানিবঞ্চিত পরিবারগুলোর হাতে এক কেজি করে মাংস তুলে দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন পর গরুর মাংস রান্না হয়েছে অনেক ঘরে। বতুয়াতলি গ্রামের বাসিন্দা মো. সুরুতজামাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “নদীভাঙনে ভাঙতে ভাঙতে আমরা একেবারে শেষ। ঈদের নামাজ পড়ার পরও মনে কোনো আনন্দ ছিল না।

আনসারী পরিবার গরু কোরবানি দেওয়ায় এবার অন্তত বাচ্চাগো মুখে গোশত তুলতে পারমু। এইডাই আমাদের বড় ঈদ।” বালাডোবার চরের বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, “চরে কোনো কোরবানি ছিল না। যার একটু সামর্থ্য আছে, সে বাজার থেইকা মুরগি কিনছে। অনেকেই সেটাও পারে নাই।

পরে আনসারী পরিবারের দেওয়া গোশত পাইয়া মনে হইছে—ঈদ গরিবের জন্যও আছে।” স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় সাড়ে চার শতাধিক চরে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। নদীভাঙন ও বন্যা এখানে মানুষের নিত্যসঙ্গী।

কেউ মাছ ধরে, কেউ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আবার কেউ দূরের শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবনসংগ্রামের এই কঠিন বাস্তবতায় কোরবানি অনেক পরিবারের কাছেই অধরাই থেকে যায়।

বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাবলু মিয়া বলেন, “বালাডোবার চর, মুসার চর ও বতুয়াতলি ইউনিয়নের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা। সরকারি সহায়তা সীমিত। এই অবস্থায় ব্যক্তি উদ্যোগে আনসারী দম্পতি গরু কোরবানি দিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটিয়েছেন।

সমাজের সামর্থ্যবানরা এভাবে এগিয়ে এলে গরিব মানুষের ঈদও আনন্দময় হবে।” বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান আনসারী বলেন, “গত কয়েক বছর ধরেই আমরা বিভিন্ন চরে কোরবানি দিয়ে আসছি। এবার দুটি গরু কোরবানি করেছি।

আল্লাহ সামর্থ্য দিলে ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই।” তিনি আরও বলেন, “ভালো কাজের প্রচার হলে অন্যরাও উৎসাহিত হন। আমিও একসময় অন্য একজনকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করি, তবে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে মাংস তুলে দিতে পারলে আত্মতৃপ্তি লাগে।

চরের সেই নিরানন্দ দুপুরে যখন মাটির চুলায় ধোঁয়া উঠছিল, তখন অনেক শিশুর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল ঈদের প্রকৃত হাসি। আর সেই হাসির পেছনে ছিল দুই মানুষের নীরব মানবিকতা ও সহমর্মিতার গল্প।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

উলিপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে আনসারী দম্পতির সহায়তায় ফিরল ঈদের আনন্দ

আপডেট সময় : ০৮:৫৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
140

নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও বন্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা কুড়িগ্রামের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদুল আজহা অনেক সময় কেবল নামাজের দিন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে। কোরবানির আনন্দ সেখানে যেন বিলাসিতা। বছরের পর বছর অনেক পরিবার ঈদের দিনেও গরুর মাংসের স্বাদ পায় না।

তবে এবার সেই নিরানন্দ ঈদে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দম্পতি মো. আসাদুজ্জামান আনসারী ও অ্যাডভোকেট নূর উন নাহার আনসারী। তাঁদের উদ্যোগে দুটি গরু কোরবানি হওয়ায় শতাধিক পরিবারের ঘরে ফিরেছে ঈদের হাসি।

২৮ মে বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতলি, বালাডোবার চর এবং পাশের সাহেবের আলগা ইউনিয়নের সাতাশ দাগের চর ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবার এবার কোরবানি দিতে পারেনি।

কোথাও একটি ছাগল কোরবানি হয়েছে, আবার কোথাও সেটিও হয়নি। অনেকেই ঈদের দিন ব্রয়লার মুরগি রান্না করে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন, কেউ তাও পারেননি। এমন বাস্তবতায় আনসারী দম্পতির দেওয়া কোরবানির মাংস যেন ঈদের প্রকৃত আনন্দ হয়ে পৌঁছায় চরবাসীর ঘরে ঘরে। কোরবানিবঞ্চিত পরিবারগুলোর হাতে এক কেজি করে মাংস তুলে দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন পর গরুর মাংস রান্না হয়েছে অনেক ঘরে। বতুয়াতলি গ্রামের বাসিন্দা মো. সুরুতজামাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “নদীভাঙনে ভাঙতে ভাঙতে আমরা একেবারে শেষ। ঈদের নামাজ পড়ার পরও মনে কোনো আনন্দ ছিল না।

আনসারী পরিবার গরু কোরবানি দেওয়ায় এবার অন্তত বাচ্চাগো মুখে গোশত তুলতে পারমু। এইডাই আমাদের বড় ঈদ।” বালাডোবার চরের বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন, “চরে কোনো কোরবানি ছিল না। যার একটু সামর্থ্য আছে, সে বাজার থেইকা মুরগি কিনছে। অনেকেই সেটাও পারে নাই।

পরে আনসারী পরিবারের দেওয়া গোশত পাইয়া মনে হইছে—ঈদ গরিবের জন্যও আছে।” স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় সাড়ে চার শতাধিক চরে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। নদীভাঙন ও বন্যা এখানে মানুষের নিত্যসঙ্গী।

কেউ মাছ ধরে, কেউ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আবার কেউ দূরের শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবনসংগ্রামের এই কঠিন বাস্তবতায় কোরবানি অনেক পরিবারের কাছেই অধরাই থেকে যায়।

বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাবলু মিয়া বলেন, “বালাডোবার চর, মুসার চর ও বতুয়াতলি ইউনিয়নের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা। সরকারি সহায়তা সীমিত। এই অবস্থায় ব্যক্তি উদ্যোগে আনসারী দম্পতি গরু কোরবানি দিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটিয়েছেন।

সমাজের সামর্থ্যবানরা এভাবে এগিয়ে এলে গরিব মানুষের ঈদও আনন্দময় হবে।” বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান আনসারী বলেন, “গত কয়েক বছর ধরেই আমরা বিভিন্ন চরে কোরবানি দিয়ে আসছি। এবার দুটি গরু কোরবানি করেছি।

আল্লাহ সামর্থ্য দিলে ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই।” তিনি আরও বলেন, “ভালো কাজের প্রচার হলে অন্যরাও উৎসাহিত হন। আমিও একসময় অন্য একজনকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করি, তবে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে মাংস তুলে দিতে পারলে আত্মতৃপ্তি লাগে।

চরের সেই নিরানন্দ দুপুরে যখন মাটির চুলায় ধোঁয়া উঠছিল, তখন অনেক শিশুর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল ঈদের প্রকৃত হাসি। আর সেই হাসির পেছনে ছিল দুই মানুষের নীরব মানবিকতা ও সহমর্মিতার গল্প।