দীপের দাবি মদ্যপানের পর হেরোইনের খোঁজে টঙ্গীর মাঠে যান তাহসিফ পুলিশ এলে বিচ্ছিন্ন হন দুজন

- আপডেট সময় : ০৬:২৮:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
তাহসিফের মৃত্যুরহস্য: শেষ রাতের ঘটনা নিয়ে যা দাবি করছেন বন্ধু দীপ
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর তদন্তে তাঁর জীবনের শেষ রাতের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসছে। রিমান্ডে থাকা বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ দাবি করেছেন, উত্তরার একটি বারে মদ্যপানের পর হেরোইনের খোঁজে টঙ্গীর একটি মাঠে যান তাহসিফ। সেখানে পুলিশের টহল দল এলে দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তবে তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পড়লেন এবং তাঁর মৃত্যু কীভাবে হলো, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা।
শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ
দীপের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, জারিকা তাসনিম দিশা ও দীপ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি বারে যান। সেখানে মদ্যপানের সময় অন্য এক যুবকের সঙ্গে দিশার সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাহসিফের কথা-কাটাকাটি হয়।
দীপের দাবি, রাত ১২টার দিকে বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তিনি ও তাহসিফ মোটরসাইকেলে টঙ্গী বাজার বস্তিসংলগ্ন একটি মাঠে যান। সেখানে তাহসিফ কয়েকজনের কাছ থেকে হেরোইন কিনে সেবন করেন বলে দাবি করেছেন দীপ। তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশ এলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন দুজন
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠে মাদক সেবনের সময় পুলিশের একটি টহল দল সেখানে আসে। এ সময় স্থানীয় লোকজন পালিয়ে যান। তিনিও নদীর পাড়ের দিকে গিয়ে একটি পিলারের পেছনে লুকান। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে নিজেকে তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দিয়ে সেখান থেকে চলে যান।
দীপ দাবি করেছেন, এরপর মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাননি। পরে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে যান। তবে তাহসিফকে নদীতে পড়তে দেখেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
দুর্ঘটনার সম্ভাবনা যাচাই করছেন তদন্তকারীরা
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাহসিফ পানিতে পড়ে গিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি এখনো তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান; মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হয়নি।
তদন্তকারীদের হাতে আসা একটি ভিডিওতে তাহসিফ ও দীপকে টঙ্গীর বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। তাঁদের মোবাইল ফোনের তথ্যসহ অন্যান্য আলামতও যাচাই করা হচ্ছে।
পরীক্ষার প্রতিবেদন পেলে স্পষ্ট হবে মৃত্যুর কারণ
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের পাকস্থলী, কিডনি ও রক্তসহ ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাসায় ফেরার বার্তা দিয়েও ফেরেননি
২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বের হন ২৮ বছর বয়সী তাহসিফ। রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। রাত ১টার দিকে তাঁর ফোন থেকে মায়ের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানেও বাসায় ফেরার কথা জানানো হয়। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদে মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পায় টঙ্গী নৌপুলিশ। পরে রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
হত্যা মামলা, বন্ধু ও তরুণী গ্রেপ্তার
ঘটনার তদন্তে কাজ শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২৯ অক্টোবর রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
৩০ অক্টোবর রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে ওই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রোববার (১ নভেম্বর) ঘটনার রাতে তাঁদের সঙ্গে থাকা জারিকা তাসনিম দিশাকেও কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, দীপ ও দিশার বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ফোনের কল রেকর্ড এবং পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন মিলিয়ে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।









