সড়কে পরিবহন খাতে যেটাকে চাঁদা বলা হয়, আমি সেটিকে সেভাবে চাঁদা হিসেবে দেখি না: সড়কমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০৫:০৩:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৩৯ বার পড়া হয়েছে
পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে আদায় করা অর্থকে চাঁদাবাজি হিসেবে দেখেন না শেখ রবিউল আলম। সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এই মন্ত্রী বলেন, এ অর্থ সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হয়, জোরপূর্বক আদায় করা হয় না—তাই একে চাঁদা বলা সঠিক নয়।
বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন। বিকেলে নিজ দপ্তরে আয়োজিত এ ব্রিফিংয়ে তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও রাজীব আহসানও উপস্থিত ছিলেন।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা বলা হলেও আমি সেটাকে চাঁদা হিসেবে দেখি না। মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতি তাদের কল্যাণমূলক কাজে এই অর্থ ব্যয় করে। এটা এক ধরনের অলিখিত নিয়মের মতো। চাঁদা তখনই বলা যায়, যখন কেউ দিতে না চাইলে তাকে বাধ্য করা হয়। এখানে মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তোলে এবং মালিকদের কল্যাণে তা ব্যবহার করে। কতটা সঠিকভাবে ব্যয় হয়, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে এটি সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়।’
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন সমঝোতার ভিত্তিতেই অর্থ সংগ্রহ করে। তবে বাস্তবে যে দলের প্রভাব বেশি থাকে, সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য দেখা যায়। ‘কিন্তু আমরা এটিকে চাঁদা হিসেবে দেখার সুযোগ পাচ্ছি না, কারণ এটি সমঝোতার ভিত্তিতে হচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।
তবে এই সমঝোতার ভিত্তিতে আদায় করা অর্থ অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে বলে জানান মন্ত্রী।
সরকারের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে শেখ রবিউল আলম বলেন, নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ শুরু করেছে। রেল সম্প্রসারণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খাল পুনঃখনন এবং সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।
ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব কি না, নাকি নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা নির্ধারণে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রেল খাতে দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কোথাও রেললাইন নির্মাণ শেষ হলেও ইঞ্জিন ও বগির অভাবে ট্রেন চালু হয়নি; আবার কোথাও ইঞ্জিন এসেছে, কিন্তু বগি নেই। প্রধানমন্ত্রী রেল খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে ইঞ্জিন ও বগি উৎপাদনের সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সমন্বয় এনে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে যাত্রাসময় কমানো, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সেবার মান উন্নয়ন এবং ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত টিকিট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ বিবেচনায় ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি বলেন, মহাসড়কে বাজার বসা, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে যানজট বাড়ছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অন-স্ট্রিট পার্কিংয়ের নামে ইজারা দেওয়ার বিষয়টি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পদ্মা সেতু-র টোল আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নিয়মিত টোল আদায় হচ্ছে এবং সেতুর কিস্তিও পরিশোধ করা হয়েছে—এ বিষয়ে কোনো বকেয়া নেই। আসন্ন ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আগের সফল মডেল অনুসরণ করা হবে এবং প্রয়োজনে নতুন কিছু পদক্ষেপ যুক্ত করা হবে। গার্মেন্টস কারখানায় আগাম ছুটি দেওয়ার প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে, তবে অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মিত বাসের বিশেষ লেন (বিআরটি) প্রকল্প নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি রাষ্ট্রবান্ধব হয়নি—এমন প্রাথমিক ধারণা রয়েছে। তবে বিপুল ব্যয় ও ঋণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না; বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।
দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, যেখানে জনস্বার্থ জড়িত, সেখানে দলীয় স্বার্থ গুরুত্ব পাবে না। কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীকে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই মন্ত্রণালয় পরিচালিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব নুরুন্নাহার চৌধুরী, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ এবং সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


















